জলাশয় বাচঁলে মৎস্য বাড়বে; মৎস্য বাড়লে দেশ বাচঁবে...

Client Logo
  • গল্প লিখেছেনঃ  রিনাত ফৌজিয়া
  • তারিখঃ 2017-04-21
  • ভিজিটঃ 257
 
জেলা প্রশাসকের নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছি প্রায় ২ বছর ৪ মাস, এর মধ্যে শতক খানেক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। কিন্তু এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে সেই দিনটির কথা, সেই কন্ঠগুলির কথা, সেই বুড়িমার আর্শীবাদের কথা। মোবাইল কোর্টের তফসিলভুক্ত ১৭ হতে ১৮ টি আইনের উপর কোর্ট পরিচালনা করেছি কিন্তু ২০১৫ সালে ২৩ আগস্ট-এ মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষন আইন, ১৯৫০ এর উপর যে কোর্টটি পরিচালনা করেছিলাম তা আমার জীবনের এখন পযর্ন্ত স্মরনীয়। হয়ত সেখানে শাস্তির পরিমাণ কম ছিল কিন্তু ঔ কোর্টের সুফল যে মানুষ পেয়েছি তা দীর্ঘ ৬ মাস পরেও জানতে পেরেছি। ঘটনার সূত্রপাত: ২২ আগষ্ট ২০১৫ দুপুরে; এডিসি জেনারেল স্যারের সাথে দেখা করতে গিয়েছি কিছু দাপ্তরিক ফাইল নিয়ে। স্যারের রুমে ছিলেন আমার ব্যাচমেট ও এ ডি এম স্যার; আলোচনা করছিলেন ‘নদীতে বাঁধ দিয়ে ক্ষমতাবান কিছু লোক মাছ ধরেছে এতে করে প্রচুর মা মাছ ও পোনা মাছ নষ্ট হচ্ছে; এটি মাছের প্রজননের সময়, এইভাবে যদি মাছ ধরা হয় তবে এক সময় মাছ শূন্য হবে নদ-নদী-খাল-বিল’। মৎস্য প্রজাতিকে বাঁচানোর জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে সরকার একটি পরিপত্র জারি করে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের পূর্বে-পরে সাধারণত প্রায় ১ মাসে বিভিন্ন নদ -নদী - খাল- বিল- বাওড় এলাকায় মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষন আইন, ১৯৫০ এর উপর মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। স্যার আমার ব্যাচমেট কে বলছিলেন, “কালকে মোবাইল কোর্টে যে যাবে সে এই আইনে কোর্ট করবে”। আমার ব্যাচমেট বলল,“স্যার, রিনাতের কালকে মোবাইল কোর্ট কিন্তু এই মোবাইল কোর্ট টি বেশ বিপদজনক ও পরিশ্রম বেশি। রিনাত কি পারবে?” আমার মুখের দিকে স্যাররা তাকালেন, তাদের চোখে জিজ্ঞাসার চিহ্ন। আমি কিছু না ভেবেই বললাম- “স্যার, ইনশাল্লাহ্‌ পারবো”। স্যার খুব শঙ্কিত মনেই বললেন, তোমাকে তেমন কিছু করতে হবে না, প্রসিকিউটর হিসাবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তোমার সাথে যাবে, এবং প্রয়োজনে ফোর্স বেশি দেওয়া হবে, আর বাকি যা লজিস্টিক পোর্ট লাগবে - তা তুমি পাবে।” উল্লেখ্য যে, ঝিনাইদহে তেমন বড় কোন নদী নেই; মাত্র একটি মাঝারি ও ৪টি ছোট ছোট নদী পুরো ঝিনাইদহ জেলায় বিস্তৃত, তবে প্রায় ৮৪ টির মত বাওড় এই অঞ্চলের মাছের প্রধান উৎস। আমি রাতে ভাল করে আইনটি পরে নিলাম এবং ইন্টারনেট হতে বিভিন্ন ধরনের জালের ছবি, কার্যকারিতা, বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার বাঁধের গঠন দেখে নিলাম। মঙ্গলবার সকাল ৬ টায় বের হলাম কোর্ট পরিচালনার জন্য, সাথে ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার প্রতিনিধি মোঃ আশরাফুল ইসলাম ও তার লোকবল। শুরু করি সদর উপজেলা দোগাছি ইউনিয়ন হতে মাগুরা সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন ফুরসন্ধি পর্যন্ত। ঔ দিন সারা দিনে কোর্ট করে নবগঙ্গা নদী ও তার শাখা নদী, ৩ টি খাল, ১ টি বাওড়ে মোট ১১ টি আড়াআড়ি বাঁধ ভেঙ্গে ছিলাম; এতে ৬ টি ৮০ থেকে ৯০ কেজি ওজনের সূতিজাল, ২০ কেজি কারেন্ট জাল, ২০-২৫ কেজি পলিথিন, বাঁশের তৈরি মাছ ধরার যন্ত্র, ১০টি লোহার তৈরি অবৈধ খাঁচা জব্দ করেছিলাম। দুঃখের বিষয়, বাঁধের মালিকদের ধরা সম্ভব হয়নি। কারণ, প্রথম বাঁধটি ভাঙতে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট সময় লেগেছিল; ততক্ষণে বাকি সব বাঁধের মালিকরা পালিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের চাচাকে শাস্তি দেওয়া। আবুল হোসেন (৬০) নামক এই ব্যক্তি নদীর পোনা মাছ, মা মাছ নিজ পুকুরে নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ হতে ৩ হাজার টাকার ব্যবসা করতেন। তার বাড়ির ও পুকুরে পাশ দিয়ে নবগঙ্গা নদীর শাখা নদী বহমান ছিল যার সাথে অনৈতিক উদ্ভোবনী প্রক্রিয়ায় (পুকুর ও নদীর মাঝে ২টি সুইচগেট করা যাতে বসানো ছিল লোহার খাচাঁ) পুকুরে পোনা মাছ, মা মাছ প্রবেশ করাতেন কিন্তু অপরপাশের সুইচগেটে লোহার খাচাঁর কারণে পানি প্রবাহের সাথে মাছ আর বের হতে পারত না; ফলে বদ্ধপানিতে যে মাছগুলি প্রজনন অসম্ভব সেগুলি মারা যাচ্ছে। গ্রামবাসী জানালেন রাতের অন্ধকারে সেগুলি মাটি চাপা দেওয়া হয়। কোর্ট চলাকালে এমন সদ্য মাটি চাপা প্রচুর মরা মাছ পাওয়া গেল; পুকুরে মরে ভেসে আছে শ’খানেক মাছ। এই প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ সম্পূর্ণ অবৈধ ও অন্যায়। মালিককে খুজে বের করতে সময় লাগলো ১ ঘন্টা। তিনি কোর্টকে অবমাননার চেষ্টা করেন, চেয়ারম্যান তার প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। সবকিছু ব্যর্থ করে তাকে ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করলাম এবং তার পুকুরের সুইচগেটটি ধ্বংস করে লোহার খাঁচাগুলি জব্দ করলাম। গাড়িতে উঠার সময় হঠাৎ এক বৃদ্ধা মহিলা দৌড়ে এসে গায়ে হাত বুলিয়ে আর্শীবাদ করলেন। সে বলেছিল, “মনি রে তুঁই যে ভালা কাজটা করলি আল্লাহ তোরে হাজার বছর বাচাঁইয়া রাখুক, আগে মাছ ছাড়া এক বেলা ভাত খাই নাই, এহন ৫-৬ বছর ধইরা বড় মাছ চোখে দ্যাহিনা। ও গো রে জেল দে, ও গো লাইগা মাছরা দেশ ছাড়ছে। আইজকা পোনারা হাসবো, নাচবো। তুঁই প্রতি বছর আইবি...” এমন আরো অনেক কথা শুনেছি ঔ দিন। আমার সাথে থাকা মোবাইল কোর্টের প্রতিটি সদস্য স্বতঃফূর্তভাবে কাজ করেছিল, ক্লান্তি বা বিরক্তি ছিলনা। আমার দলে মাত্র ১০ জন শ্রমিক ছিল, বাঁধ ভাঙ্গার জন্য যা যথেষ্ট নয়, আশেপাশের মানুষরা স্বউদ্যোগে আমাদের সাহায্য করেছে। নদীর পাড়ে, বাওড়ের চারদিকে শত শত মানুষ ছিল কিন্তু আমাদের কোর্টের কাজে কোনো বাঁধা দেয় নি বরং আমার কথা ব্যস্‌বাক্যের মত শুনেছে। জব্দকৃত মালামাল নিষ্পত্তিতেও তারা আমাদের সাহায্য করেছে। জব্দ করা মালামালের বাকী অংশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার জিম্মায় ধ্বংস করার আদেশ দেই। সন্ধ্যায় যখন কোর্ট শেষ করে গাড়িতে করে ফিরছি তখন ২ পাশে অনেক লোক আমাদের কে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। প্রায় ৫ মাস পর ঔ ইউনিয়নে একটি তদন্তে যাই; অনেকেই আমাকে মনে রেখেছে, কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, “ম্যাডাম, এই বছর আমরা অনেক প্রকারের মাছ খাইছি যা ২-৩ বছর খাই নাই...।” পরে জানতে পারলাম, ঔ মোবাইল কোর্ট-এর পর ২টা স্থানে বাঁধ তৈরির চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হতে পারে না সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের কারণে। হয়ত আপেক্ষিকভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে এর প্রভাব চোখে পড়ার মত নয় কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে একজন ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট দ্বারা এমন অনেক কিছুই করতে পারে যা হয়ত দাপ্তরিকভাবে সম্ভব না। সেদিনের সচেতনমূলক দু’টি কথা মানুষকে এত আবেগতাড়িত করবে আমি ভাবি নি। মোবাইল কোর্টের উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, মানুষকে জাগ্রত করা, সচেতন করা। সেদিন মনে হয়েছে “আজ ঐ নদীর সব মাছ স্বাধীনতা পেলো, আমরা সফল। দেশকে বাচাঁনোর জন্য, দেশের মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য যে প্রত্যয় নিয়ে আমি এই সার্ভিসে এসেছি – এই মোবাইল কোর্ট আমাকে তার স্বাদ সরাসরি দিয়েছে”। রিনাত ফৌজিয়া (১৭৫৯৪) সহকারী কমিশনার (৩৩ তম বিসিএস), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঝিনাইদহ এবং প্রশিক্ষণার্থী, রোল ৩২, ১০১ তম আইন ও প্রশাসন কোর্স, বিসিএস এডমিন একাডেমি, শাহবাগ, ঢাকা।

 প্রিন্ট